
বেগম রোকেয়ার বাড়িতে বাংলা বলাটাকে ঘৃণা করা হতো। তারা ছিল অভিজাত শ্রেণীর। ভাষা ছিল মূলত আরবি,ফারসি আর ইংরেজি।বেগম রোকেয়া চুরি করেই বাংলা শিখতো বলা যায় একদিন বাবার কাছে ধরা খান উনি বাংলা শিখতে গিয়ে। তবে বাবা তাকে কিছুই না বলে বরং শেখার সুযোগ করে দেন। মূলত তার বাংলা লেখার হাতপাকা হয় বড় বোন করিমুন্নেসার বাড়িতে টাঙ্গাইলে।
১৯০৯ সালে তিনি বিধবা হন । তার সতীন ও সন্তানরা তখন তার বিহারের স্কুল ভেঙ্গে দেয়। টাকা নিয়ে নেয় সত ছেলেরা, সবকিছু ভেঙ্গে দিলে তিনি কলকাতায় আসেন।কলকাতায় সাওখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল খোলেন যেখানে উর্দূ ভাষায় পড়ানো হতো এবং পরবর্তীতে ইংলিশ ভার্সন স্কুল হয় যেটা।
কলকাতায় যে তার জীবন আরামের ছিল তাও না সেখানে ততকালীন হিন্দুরা বলাবলি শুরু কলো রূপের দোকান খুলে বসছে। রোকেয়া তার পদ্মরাগ উপন্যাসে এসব কথা বলেন। মহিলা সমিতি করেন । সে সময়ে তার নারী উন্নয়ন বিষয়ক সমিতি ছিল ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতীন ইসলাম’’। রোকেয়ার এসব চিন্তার Implementation হয়েছে ১৯৬০-৬৫ সালে ইউরোপে।তখন আসলে হিন্দু সমাজেও পর্দা প্রথা ছিল সে সময় রবিন্দ্রনাথের পরিবারে একজন মেয়ের নদীতে গোসলের কথা আমরা জানি। তাকে পালকিতে করে গোসল করে বাড়িতে ফিরতে হয়েছিল।
কাজী নজরুলের সাথে তার পরিচয় ছিল তখন তিনি ‘লাঙল’ পত্রিকায় ‘পিপাসা’ নামে প্রবন্ধও লিখেন।তবে রবিন্দ্রনাথ এই ভদ্র মহিলাকে নিয়ে কিছু বলেননি বা লিখেননি। আমার মনে হয় ভাবত সে রোকেয়া একটা বেয়াদব মেয়ে।
অনেকে এখন যেমনটা ভাবে তখনকার তসলিমা নাসরিন ছিল রোকেয়া। তাকে বলা হয় বাঙালী মুসলমান নারী জাগরনের আগ্রদূত।
বেগম রোকেয়ার জীবন ও কর্ম ছিল তৎকালীন সমাজের কঠোর রীতিনীতি এবং রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে এক নীরব অথচ বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। তাঁর নিজের বাড়িতেই বাংলা ভাষার প্রতি একরকম বিদ্বেষ ছিল। তাঁরা ছিলেন উচ্চবিত্ত বা অভিজাত শ্রেণী, যাঁদের দৈনন্দিন জীবনে আরবি, ফারসি ও ইংরেজির প্রচলন ছিল মুখ্য। এই ভাষাগত পরিবেশের কারণে, ছোটবেলা থেকেই রোকেয়াকে বাংলা শেখার জন্য কঠোর সংগ্রামের সম্মুখীন হতে হয়েছিল।
তাঁর বাংলা শেখার প্রক্রিয়াটি ছিল অনেকটা গোপনে, বলা যায় চুরি করে শেখা। একদিন তাঁর বাবা শেখ জহিরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবেরের কাছে ধরা পড়ে গেলেও, অপ্রত্যাশিতভাবে তিনি কোনো বাধা দেননি। বরং কন্যার শেখার আগ্রহ দেখে তিনি তাকে সুযোগ করে দেন। তবে, রোকেয়ার বাংলা লেখার ভিত্তি এবং হাতপাকা হয় মূলত তাঁর বড় বোন করিমুন্নেসার বাড়িতে, যা ছিল টাঙ্গাইলে। করিমুন্নেসা ছিলেন রোকেয়ার জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা।
রোকেয়ার ব্যক্তিগত জীবনেও ছিল নানা চড়াই-উতরাই। ১৯০৯ সালে স্বামী খান বাহাদুর সাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যুর পর তাঁর জীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় আসে। তাঁর স্বামীর প্রথম পক্ষের সন্তানরা (সৎ ছেলেরা) বিহারের ভাগলপুরে প্রতিষ্ঠিত তাঁর স্কুলটি ভেঙে দেয় এবং টাকা পয়সা আত্মসাৎ করে। সবকিছু হারিয়ে তিনি এক প্রকার বাধ্য হয়ে কলকাতায় চলে আসেন।কলকাতায় এসে তিনি পুনরায় শিক্ষামূলক কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে এই বিদ্যালয়ে উর্দু ভাষায় শিক্ষাদান করা হলেও, পরবর্তীকালে এটি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে রূপান্তরিত হয়।
কলকাতাতেও রোকেয়ার জীবন সহজ ছিল না। তিনি যখন নারী শিক্ষার প্রসারে কাজ করছিলেন, তখন রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ তার এই উদ্যোগকে ‘রূপের দোকান’ খোলার মতো কটাক্ষ করতে শুরু করে। এই ধরনের সামাজিক সমালোচনা ও প্রতিবন্ধকতার কথা তিনি তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘পদ্মরাগ’-এ তুলে ধরেছেন।
নারী সমাজের উন্নতির জন্য রোকেয়া শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই গড়েননি, তিনি নারী সংগঠনও প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নারী উন্নয়ন বিষয়ক সমিতিটির নাম ছিল ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতীন ইসলাম’। নারীর অধিকার ও মুক্তির পক্ষে রোকেয়ার এই সুদূরপ্রসারী চিন্তাগুলির বাস্তবায়ন মূলত ঘটেছিল অনেক পরে, ইউরোপীয় সমাজে, বিশেষত ১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সালের দিকে।
তৎকালীন সমাজ, বিশেষ করে হিন্দু সমাজেও পর্দা প্রথার প্রচলন ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারের একটি মেয়ের নদীতে স্নান করতে যাওয়ার ঘটনা থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। সেই মেয়েটিকেও পালকিতে করে স্নান সেরে বাড়িতে ফিরতে হতো, যা সমাজে নারীর চলাচলের উপর আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধের ইঙ্গিত দেয়।
বেগম রোকেয়ার সাথে কাজী নজরুল ইসলামের ভালো পরিচয় ছিল। নজরুলের সম্পাদিত ‘লাঙল’ পত্রিকায় তিনি ‘পিপাসা’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধও প্রকাশ করেছিলেন। এর মাধ্যমে তৎকালীন সাহিত্য ও সামাজিক আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রমাণ মেলে।
তবে, লক্ষণীয় বিষয় হলো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বিদুষী মহিলাকে নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য বা লেখালেখি করেননি। লেখকের ব্যক্তিগত বিশ্লেষণে মনে হয়েছে, হয়তো রবীন্দ্রনাথ রোকেয়াকে ‘বেয়াদব মেয়ে’ হিসেবে দেখতেন, কারণ রোকেয়ার প্রগতিশীল ও প্রতিবাদী মানসিকতা হয়তো তাঁর রক্ষণশীল সমাজের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল।
অনেক আধুনিক বিশ্লেষক রোকেয়াকে তাঁর সময়ের ‘তসলিমা নাসরিন’ হিসেবে তুলনা করেন, অর্থাৎ তৎকালীন সমাজের রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক স্পষ্টভাষী ও আপোষহীন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তাঁর প্রগতিশীল চিন্তা, সমাজের অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী তাঁকে বাঙালি মুসলমান নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।