গত বছর ১০০ টাকায় যা কিনতাম, এবার সেটা ১০৯ টাকা আপনার আয় কি ৯ টাকা বাড়ছে?

একটা সহজ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি।

AlAmin | ১৮ মে ২০২৬


মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশ অর্থনীতি ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা সংসার খরচ সঞ্চয়পত্র inflation Bangladesh আয় বাড়ানোর উপায় জীবনযাত্রার খরচ ঢাকা আর্থিক পরিকল্পনা

গত বছর মে মাসে আপনি বাজারে গিয়েছিলেন। হাতে ছিল ৫ হাজার টাকা। সেটা দিয়ে সংসারের একটা সপ্তাহের বাজার হয়ে গিয়েছিল। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ মোটামুটি সব।

এবার একই বাজারে যান। হাতে সেই একই ৫ হাজার টাকা। দেখবেন অর্ধেক থলে ভরতেই টাকা শেষ।

কিছু চুরি হয়নি। দোকানদার ঠকায়নি। এটা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি  যেটা নিয়ে খবরে অনেক কথা হয়, কিন্তু আসলে কী হচ্ছে সেটা সহজ করে কেউ বলে না।

আজকে আমি সেটাই বলব। একদম সহজ ভাষায়।


আসলে কী হচ্ছে?

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, ২০২৬ সালের মে তে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

এই ৯ শতাংশ মানে কী?

মানে হলো  গত বছর মে মাসে আপনি যেটা ১০০ টাকায় কিনেছিলেন, এই বছর মে মাসে সেটার দাম ১০৯ টাকা।

শুধু একটা জিনিস না। সবকিছু। চাল থেকে শুরু করে বাচ্চার স্কুলের ব্যাগ পর্যন্ত। ডাক্তারের ফি থেকে রিকশা ভাড়া পর্যন্ত।

এখন একটাই প্রশ্ন  আপনার আয় কি গত এক বছরে ৯ শতাংশ বেড়েছে?

যদি বেড়ে থাকে আপনি আগের জায়গায় আছেন।

যদি না বেড়ে থাকে আপনি আসলে গরিব হয়ে গেছেন। কাউকে বলতে হয়নি, কোনো দুর্ঘটনা হয়নি, কিন্তু আপনার জীবনমান আস্তে আস্তে নিচে নামছে।

বাংলাদেশে বেশিরভাগ মানুষের বেতন বেড়েছে বছরে ৪ থেকে ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ। মানে ফাঁকটা প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ। প্রতি বছর এই ফাঁক বাড়ছে। 


এর মানে আপনার জীবনে কী হচ্ছে সত্যিকারের হিসাব

চলেন একটু হিসাব কষে দেখি। ধরেনআপনার মাসিক আয় ৩০ হাজার টাকা।

গত বছর এটা দিয়ে সংসার চলত। এবার এই ৩০ হাজার টাকার সত্যিকারের মূল্য হচ্ছে ২৭ হাজার ৫০০ টাকার মতো। কারণ বাকি আড়াই হাজার টাকা মূল্যস্ফীতি খেয়ে নিয়েছে।

আপনি বুঝতেও পারেননি। কিন্তু হচ্ছে। প্রতিদিন একটু একটু করে।


যা হচ্ছে আপনার ঘরে কেউ মুখে বলে না, কিন্তু সবাই জানে

পাতে মাছ-মাংস কমে গেছে

আগে সপ্তাহে তিন-চারদিন মাছ বা মাংস হতো। এখন দুইদিন। এমনকি সেটাও হয়তো ছোট পিস। মা বলছেন না, কিন্তু রান্নাঘরে হিসাব করছেন।

এটা শুধু সুখ-দুঃখের বিষয় না। এটা পুষ্টির বিষয়। বাচ্চা যদি প্রোটিন না পায়, তার বিকাশ ধীর হয়। সেটার দাম পরে দিতে হবে।

সংসারে ঝগড়া বাড়ছে

টাকার টানাটানি থাকলে মানুষ চিড়চিড়ে হয়ে যায়। ছোট ছোট বিষয় নিয়ে বাকবিতণ্ডা হয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে, বাবা-মায়ের মধ্যে, ভাই-বোনের মধ্যে।

মনোবিজ্ঞান বলে আর্থিক চাপ পরিবারের ভেতরে যে উত্তেজনা তৈরি করে, সেটা অন্য কোনো কারণে এত সহজে হয় না। কারণ টাকার সমস্যা সবার উপর একসাথে পড়ে।

কেনাকাটায় কোপ

নতুন জামা কেনার কথা ছিল। ঈদে পুরনোটা দিয়েই কাজ চালিয়েছেন। বাচ্চার জন্য নতুন জুতা দরকার ছিল, একটু বড় হলে কিনব বলে রেখে দিয়েছেন। নিজের জন্য যেটা চাইছিলেন, সেটা লিস্টেই রয়ে গেছে।

এই ছোট ছোট কোপগুলো একটা সময় মানুষের মানসিক শক্তি কমিয়ে দেয়।

ছেলেমেয়ের পড়াশোনায় টান

প্রাইভেট টিউটর বাদ হয়ে গেছে। বড় ক্লাসে যে বই লাগত, অনলাইনে PDF খুঁজছেন। কোচিং-এর ফি দিতে পারছেন না।

শিক্ষায় যে বিনিয়োগ কমে, সেটার ক্ষতি দেখা যায় ১০ বছর পরে। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়।

ওষুধ কিনতে গিয়ে আর্ধেক কিনছেন 

ডাক্তার ১০ দিনের ওষুধ লিখে দিয়েছেন। আপনি কিনেছেন ৫ দিনের। কারণ একসাথে পুরো টাকাটা বের হচ্ছে না। এটা শুনতে ছোট মনে হয়, কিন্তু এটা আসলে নীরবে স্বাস্থ্যের সাথে আপস করা।

ব্যাংকের টাকাও গলছে

হয়তো ভাবছেন যাই হোক, ব্যাংকে তো কিছু সঞ্চয় আছে। সেটা নিরাপদ আছে।

আসলে নাই।

ব্যাংকে সুদ পাচ্ছেন ৬ থেকে ৭ শতাংশ। কিন্তু মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ। মানে প্রতি বছর আপনার সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য ২ থেকে ৩ শতাংশ কমছে। টাকার সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু কেনার ক্ষমতা কমছে।

এক লাখ টাকা ব্যাংকে রেখেছেন। এক বছর পরে দেখবেন ১ লাখ ৭ হাজার হয়েছে। কিন্তু সেই টাকায় গতবছর যা কিনতে পারতেন, এখন তার চেয়ে কম কিনতে পারবেন।


কেন হচ্ছে এটা ?

সব দোষ এক জায়গায় দেওয়া ঠিক না। অনেকগুলো কারণ একসাথে কাজ করছে।

এই বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ লেগেছে। তেলের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তেলের দাম ৫৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। তেল বাড়লে পরিবহন বাড়ে, পরিবহন বাড়লে সব পণ্যের দাম বাড়ে। বাংলাদেশ তেল আমদানি করে, তাই এই আঘাত সরাসরি আমাদের গায়ে লেগেছে।

এছাড়া দেশের ব্যাংকগুলোতে বিশাল পরিমাণ খেলাপি ঋণ আছে। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। কর্মসংস্থান কমছে। এই চাপ শেষে এসে পড়ছে সাধারণ মানুষের উপর।


তাহলে কী করবেন? 

সরকারের সমাধান আসতে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগবে। কিন্তু আপনার পেট প্রতিদিন লাগে। তাই নিজেকেই কিছু করতে হবে।

এক. আয়ের হিসাব- সততার সাথে

কাগজে লিখতে পারেন অথবা নোটপ্যাডে। মাসে আসলে কত আসছে আর কোথায় যাচ্ছে। না লিখলে কোনো সমাধানই কাজ করবে না। বেশিরভাগ মানুষ এই একটা কাজ না করার কারণেই টাকা কোথায় যাচ্ছে ধরতে পারেন না।

দুই. আয় বাড়ানোকে প্রথম লক্ষ্য বানান

মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ মানে আপনার আয় কমপক্ষে ১০ শতাংশ বাড়াতে হবে  শুধু একই জায়গায় থাকতে। ফ্রিল্যান্সিং, পার্টটাইম কাজ, নিজের কোনো ছোট ব্যবসা  যেটাই হোক, একটা বাড়তি আয়ের পথ খোলা থাকলে এই চাপ অনেক কমে যায়।

ডলারে আয় করতে পারলে আরও ভালো। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি আপনাকে ততটা ছুঁতে পারবে না।

তিন. ব্যাংকে ফেলে রাখবেন না + বিনিয়োগ করেন

সরকারি সঞ্চয়পত্রে এখন ১১ থেকে ১২ শতাংশ রিটার্ন পাওয়া যাচ্ছে। যেটা সুদ। ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করেন কাজে দিবে।  অবশ্যই দেখে নিবেন ব্যবসায়ীর ধ্যান-জ্ঞান শুধু ব্যবসাতে কিনা! এবং সৎ ব্যক্তি কিনা। সৎ,কর্মঠ এবং ব্যবসা বুঝে এমন মানুষ হতে হবে। ৩ টার ২ টা থাকলেও হবেনা। 

চার. খরচের ফাঁকফোকর বন্ধ করতে পারলে ভালো

ফুড ডেলিভারির ফাঁদে আমিও আটকা, না চিন্তা করে subscription কেনা, ক্রলিং করে জরুরী ফালতু কাজ করা যাবে না।  একটু হিসাব করলেই দেখবেন মাসে চার থেকে আট হাজার টাকা যাচ্ছে। 

পাঁচ. দক্ষতায় বিনিয়োগ করেন নিয়মিত

মূল্যস্ফীতি টাকার মান কমাতে পারে, কিন্তু আপনার দক্ষতার মান কমাতে পারে না। নতুন কিছু শেখা, অনলাইনে কোর্স করা, নিজের বিষয়ে আরও গভীরে যাওয়া  এটা এই মুহূর্তে সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ।

ছয়. পরিবারের সাথে কথা বলেন দিল ‍খুলে একা বহন করবেন না

সব বলতে না পারা আমার আরেক সমস্যা। 

আর্থিক চাপ একা বহন করলে একসময় ভেঙে পড়েন মানুষ। স্বামী হলে স্ত্রীকে বলতে হবে, স্ত্রী হলে স্বামীকে বলতে হবে। অথবা নির্ভরযোগ্য কাউকে বলতে হবেই হবে।  একসাথে বসে plan করলে অনেক সমস্যার সমাধান বের হয়ে আসে যেটা একা ভাবলে মাথায় আসে না।


শেষ কথা এবং সত্যি কথা

মূল্যস্ফীতি আপনার দোষে হয়নি। কিন্তু এর সমাধান আপনাকে আমাকেই  করতে হবে। সরকার নীতি বানাবে, ব্যাংক সুদের হার ঠিক করবে, বিশেষজ্ঞরা বিশ্লেষণ করবেন  কিন্তু মাসের শেষে আপনার আমার সংসারটা চালাতে হবে।

যে মানুষ বোঝেন কী হচ্ছে, তিনি ভয় পান না। বরং ঠান্ডা মাথায় ভাবেন  এই অবস্থায় আমি কী করতে পারি।

আপনি সেই মানুষ হোন।

একটা ছোট পদক্ষেপ আজকেই নেন। একটা নতুন দক্ষতা শেখার সিদ্ধান্ত নেন যেটা আপনার ব্যক্তিত্বের সাথে যায়। ঝুঁকি নেন , বিনিয়োগ করেন বুঝে শুনে। আল্লাহ তায়ালা আপনাকে আমাকে উত্তর বারাকা দান করুক আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

activeAlamin

আল-আমিন

ডিজিটাল বিজনেস কনসালটেন্ট ও উদ্যোক্তা

ফলো করুন