দেশ বদলায় আন্দোলনে, আমরা বদলাই ভালোবাসায়

২০২৪ সালের ৯ই আগস্ট।

দেশ যখন তুমুল আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এক নতুন যুগে প্রবেশ করছিল, ঠিক তখনই আমার আর এমিলীর জীবনেও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এ সেই এমিলী, যে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে একজন বেকার তরুণের সাথে ঘর বাঁধার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

বিয়ের পর আমাদের চিলেকোঠার ছোট্ট ঘরটাতেই এমিলী সেমিস্টারে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করেছে। আমার ছায়াসঙ্গী হয়েই দিনের শেষে সমস্ত দুশ্চিন্তা ভুলে সে থাকত নিশ্চিন্ত। আমাদের দৈনন্দিন জীবনটা আর দশটা পরিবারের মতো ধরাবাঁধা নিয়মে চলে না। যখন মন চায় আর মেজাজ থাকে, রান্না হয়; নাহলে হয় না। ঘরের কাজে আমরা একে অপরের পরিপূরক। আমাদের মধ্যে একে অপরকে নিয়ে না আছে কোনো অভিযোগ, না আছে কোনো বিদ্বেষ।

মাঝে মাঝে আমাদের দুজনের ইচ্ছের মিলগুলো দেখলে অবাক হতে হয়; মনে হয়, এ যেন সৃষ্টিকর্তার এক বিশেষ উপহার। কতবার এমন হয়েছে, আমি ওকে কিছু একটা কিনে দেব ভাবছি, আর কিছুক্ষণ পরেই দেখি ও ঠিক সেই জিনিসটার কথাই বলছে। একদিন মোমো নিয়ে বাসায় ফিরে দেখি, ওর চোখে জল টলমল করছে। কারণটা শুনে অবাক হলাম একটু আগেই নাকি ওর খুব মোমো খেতে ইচ্ছে করছিল!

আমি হয়তো ওকে বড় কিছু দিতে পারিনি, কিন্তু ওর ছোট ছোট শখ আর ইচ্ছেগুলোর মূল্য আমার কাছে অসীম। আমি চাই, ও ওর মতো করে বাঁচুক, নিজের পছন্দগুলোকে আঁকড়ে ধরুক। ওর শখের তালিকায় আছে স্টেশনারি জিনিসপত্র জমানো, নীলক্ষেত ঘুরে বই কেনা, সাজগোজ করা, আর অনলাইনে শাড়ি বা ড্রামা দেখা।

তবে মজার ব্যাপার হলো, আমাদের মধ্যে অমিলও কম নয়। ও খেতে বসে কার্টুন দেখবে, আর আমি ভালোবাসি সম্পূর্ণ নীরবতায় খেতে। আমার পছন্দ ক্লাসিক সবকিছু, ওর পছন্দ আধুনিকতা।

ও কিছুটা অভিমানী, আর আমি ঠিক তার বিপরীত বরফের মতো ঠান্ডা। বিয়ের এই শিক্ষাকে আমি জীবনের এক নতুন গ্র্যাজুয়েশন বলব। যারা এই ‘জীবন বিশ্ববিদ্যালয়ে’ ভর্তি হননি, তারা হয়তো এর গভীরতা বুঝবেন না। আর ভর্তি হলেও যে সমাবর্তন পাবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

একসময় ওর স্বপ্ন ছিল ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার। এটা ছিল একান্তই ওর নিজের স্বপ্ন, পরিবারের চাপিয়ে দেওয়া নয়। পরিবারের চাওয়াগুলো তো ভেরিয়েবল, কখনো ইঞ্জিনিয়ার, কখনো আইনজীবী, আর এখন বিসিএস ক্যাডার। আমার স্বপ্ন হলো, ওর ভেতরের সেই আসল সত্তাটার পূর্ণ বিকাশ ঘটানো। সেই বিকাশ ওর ভালো লাগা থেকে আসুক, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে, কিংবা অন্য কোনো অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্র থেকেই হোক না কেন।

আমি এই ক্ষুদ্র জীবনে বুঝেছি, মানুষের ইচ্ছেগুলোকে হত্যা করলে সে আর মানুষ থাকে না, একটা যন্ত্রে পরিণত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে নিরাপত্তাজনিত কারণে সে বিতর্ক ক্লাব বা কোনো অনুষ্ঠানে যেতে পারেনি। আজ আমি তাকে এসব কিছুতে উৎসাহ দিই। ফিরে এসে যখন ও উচ্ছ্বাসের সাথে সবকিছুর বর্ণনা দেয়, আমি ওর মধ্যেকার আসল মানুষটাকে নতুন করে আবিষ্কার করি।

ও নিজ হাতে রান্না করে আমাকে খাওয়াতে ভালোবাসে। আমার কেনাকাটা থেকে শুরু করে প্রতিদিন কী পরব, সবকিছুর দায়িত্ব যেন সে নিজের ইচ্ছেতেই কাঁধে তুলে নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে আমি নিজের তৈরি এক জগতে একাই বাস করতাম। আমি ছিলাম সেই রাজ্যের রাজা, কিন্তু আমার এলোমেলো জীবনে কোনোদিন রানীর আগমন ঘটবে, তা ভাবিনি। হয়তো আমার কোনো ভালো কাজের বিনিময়ে আল্লাহ তাকে আমার জীবনে পাঠিয়েছেন।

আমার জন্য সে যা করেছে বা করে, আমার বিশ্বাস এই পৃথিবীতে আর কেউ তা করবে না। এই অসাধারণ মানুষটাকে নিয়ে আমি সুস্থভাবে বাঁচতে চাই। আর পৃথিবীকে দেখিয়ে দিতে চাই নিজেদের মতো করে, নিজেদের শর্তে বেঁচে থেকেও সেরা হওয়া যায়।

ভালোবাসি তোমাকে সবচেয়ে বেশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

activeAlamin

আল-আমিন

ডিজিটাল বিজনেস কনসালটেন্ট ও উদ্যোক্তা

ফলো করুন

Receive the latest news

আপনার বিনজেসকে নতুন করে নিজের চোখে দেখতে + ইনকাম 2x+ করতে