
বাংলার মাটিতে ইসলাম এসেছে বখতিয়ার খিলজীর হাত ধরে, এই ধারণাটিই আমরা বছরের পর বছর জেনে এসেছি। কিন্তু লালমনিরহাটের একটি প্রাচীন মসজিদ সেই প্রচলিত ইতিহাসকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
লালমনিরহাটে অবস্থিত সাহাবী হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর হাতে তৈরি মসজিদ, নির্মিত হয়েছে ৬৯ হিজরীতে।
হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) ছিলেন রাসূল (সা.)-এর মামা। নৌপথে তিনি চীন দেশে গমনের সময় বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং লালমনিরহাটে এই রুট ব্যবহার করে চীনে যাওয়ার সময় যাত্রাবিরতি দিয়েছিলেন।
আবিষ্কারের ইতিহাস
১৯৮৬ সাল। লালমনিরহাটের পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নে এক জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে উন্মোচিত হয় মাটির নিচে চাপা পড়া এক বিস্ময়কর ইতিহাস। স্থানীয়ভাবে ‘মজদের আড়া’ বা ‘হারানো মসজিদ’ নামে পরিচিত।
এই ধ্বংসাবশেষের একটি ইটে স্পষ্ট আরবি হরফে খোদাই করা ছিল-
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ও ৬৯ হিজরি” (৬৮৯ খ্রিস্টাব্দ)।
৬৯ হিজরি অর্থাৎ প্রিয় নবীজি (সা.)-এর ওফাতের মাত্র ৫৮ বছর পরের সময়কাল, যখন অনেক সাহাবী পৃথিবীতে জীবিত ছিলেন এবং ইসলামের দাওয়াত নিয়ে দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ছিলেন।
গবেষণা কী বলে?
বিখ্যাত ব্রিটিশ গবেষক ও প্রত্নতাত্ত্বিক টিম স্টিল (Tim Steel) দীর্ঘ গবেষণা শেষে নিশ্চিত করেছেন যে, প্রাচীনকালে আরবের বণিকরা বিখ্যাত ‘সিল্ক রোড’ ধরে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের রুট ব্যবহার করে চীনের ক্যান্টন বন্দরে যাতায়াত করতেন।
গবেষকদের প্রবল ধারণা, রাসূল (সা.)-এর মামা এবং বিখ্যাত সাহাবী হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি দল সফরের সময় এই পথেই যাত্রা করেছিলেন।
যাত্রাবিরতিকালে তাঁদের পবিত্র হাতেই এই অঞ্চলের মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আসেন এবং তাদের জন্য নির্মিত হয় ঐতিহাসিক এই সাহাবী মসজিদ।
এই মসজিদ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
এই মসজিদটি দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক জীবন্ত দলিল। এটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে, ১২০৪ সালে বখতিয়ার খিলজীর আগমনের বহু আগেই এই উর্বর জনপদে ইসলামের সুশীতল ছায়া পৌঁছেছিল।
৬৯ হিজরির এই নিদর্শন সাক্ষ্য দেয়
বাংলার মাটির সাথে ইসলামের সম্পর্ক কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং আমাদের শেকড় প্রোথিত আছে সরাসরি সাহাবীদের যুগে, যা আমাদের ঐতিহ্যকে করেছে মহিমান্বিত।
ইতিহাস জানি, শেয়ার করি কারণ আমাদের শেকড়ের গল্প আমাদেরই বলতে হবে।